২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, আন্দোলনকারীদের ভাষায় ‘৩৫ জুলাই’— বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিনই শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেশজুড়ে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন, ব্যাপক সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং কারফিউর মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সরকারের ওপর বাড়তে থাকা চাপ।
সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিহতদের মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন আন্দোলনকারীরা। মিছিলটি শাহবাগে পৌঁছালে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। দিনজুড়ে রাজধানীর শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও সরকারপন্থি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়।
এর আগের দিন, ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ থেকে সমন্বয়করা শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন এবং ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাক দেন। তবে ৪ আগস্ট সারা দেশে ব্যাপক সহিংসতা, প্রাণহানি এবং আন্দোলনের বিস্তৃতি বিবেচনায় নিয়ে রাতে কর্মসূচিটি এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার সহিংসতা চালিয়ে গেলে আন্দোলনকারীরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাবে। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতিটি এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং সরকার পতন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
রাজধানীর বাইরে সিরাজগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, বগুড়া, রংপুর, সিলেট, পাবনা, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন দেশজুড়ে অন্তত ৯৩ জন নিহত হন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাজধানীসহ বিভাগীয় শহর, জেলা সদর, উপজেলা সদর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও শিল্পাঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে। একই সঙ্গে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ৫ আগস্ট থেকে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
৪ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহই মূলত পরদিনের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে। কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের মধ্যেও আন্দোলন থামেনি; বরং ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আন্দোলনের গতি আরও তীব্র হয়। পরদিন ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে তার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নিন্দা জানিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি তোলে। একই দিনে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের একটি প্রস্তাবও তুলে ধরে।
দিনটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত। আন্দোলনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, সরকার ৬ আগস্টের কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে- এমন তথ্য পাওয়ার পর কৌশলগত কারণে কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন করা হয়। রাতেই সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ পৃথক বার্তায় ৫ আগস্টই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।