September 14, 2026, 5:02 am

সংস্কারের অভাবে সৌন্দর্য হারাচ্ছে পাইকগাছার ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা পার্ক

Reporter Name
  • Update Time : Thursday, August 6, 2026
  • 8 Time View

‎দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আইনি লড়াই, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে খুলনার পাইকগাছা পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জেলা পরিষদের মালিকানাধীন ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা পার্কের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এতে পার্কটি দখলমুক্ত হলেও সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখনো তার হারানো ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য ফিরে পায়নি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।

‎জানা যায়, ১৯৮০ সালে তৎকালীন খুলনার জেলা প্রশাসক নূরুল ইসলাম মধুমিতা পার্ক উদ্বোধন করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেন। প্রায় ১.৪৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এ পার্কে বিভিন্ন প্রজাতির ছায়াদার ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ, ফুলের বাগান, বসার বেঞ্চ, হাঁটার জন্য উন্মুক্ত স্থান এবং জেলা পরিষদের একটি মিঠাপানির পুকুর ছিল। প্রতিদিন বিকেলে শিশু, কিশোর, নারী-পুরুষ ও প্রবীণরা এখানে সময় কাটাতেন। ঈদ, পূজা ও বিভিন্ন উৎসবেও পার্কটি ছিল মানুষের মিলনমেলায় মুখর।

‎কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্বের কারণে পার্কের পরিবেশ নষ্ট হতে থাকে। পার্কের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক দোকানঘর, পাকা স্থাপনা ও অন্যান্য অবৈধ অবকাঠামো গড়ে ওঠে। এতে পার্কের উন্মুক্ত পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের বিনোদনের সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

‎এ অবস্থায় স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মধুমিতা পার্ক রক্ষায় আন্দোলন শুরু করেন। পরে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পার্কের অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হয়। এ ঘটনায় এলাকাবাসী স্বস্তি প্রকাশ করলেও তাদের প্রত্যাশা ছিল—উচ্ছেদের পর দ্রুত পার্কটি আধুনিকায়ন করে জনসাধারণের জন্য আকর্ষণীয়ভাবে উন্মুক্ত করা হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো সে ধরনের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

‎বর্তমানে পার্কের বিভিন্ন স্থানে আগাছা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ভাঙাচোরা অংশ, নষ্ট হয়ে যাওয়া বসার স্থান এবং অবহেলার চিত্র স্পষ্ট। পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনে নতুন করে বৃক্ষরোপণ, ফুলের বাগান, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, হাঁটার পথ, শিশুদের খেলাধুলার সরঞ্জাম, বিশ্রামাগার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। জেলা পরিষদের পুকুরটিও যথাযথ পরিচর্যা ও সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলার দাবি উঠেছে।

‎স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মধুমিতা পার্ক শুধু একটি পার্ক নয়; এটি পাইকগাছার মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ। দীর্ঘদিন অবৈধ দখলের কারণে পার্কটি তার অস্তিত্ব হারাতে বসেছিল। আদালতের নির্দেশনায় দখলমুক্ত হওয়ায় তারা আনন্দিত। তবে শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না; পরিকল্পিত সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে পার্কটি আবারও অবহেলার শিকার হবে। তারা দ্রুত একটি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করে পার্কটিকে আধুনিক ও পরিবারবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানান।

‎এ বিষয়ে পাইকগাছা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট এফ. এম. এ. রাজ্জাক বলেন, মধুমিতা পার্ককে অবৈধ দখলমুক্ত করতে দীর্ঘদিন আইনি লড়াই করতে হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অবশেষে পার্কের অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ হয়েছে, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, এখন জেলা পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পার্কটিকে পরিকল্পিতভাবে সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ ও প্রবীণসহ সব শ্রেণির মানুষের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।

‎পাইকগাছার প্রবীন এড জিএ এ সবুর বলেন, মধুমিতা পার্কের উন্নয়ন শুধু একটি পার্ক সংস্কারের বিষয় নয়; এটি পাইকগাছা পৌরসভার পরিবেশ, সামাজিক জীবন ও নাগরিক বিনোদনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিকল্পিতভাবে পার্কটি পুনর্গঠন করা হলে এটি ভবিষ্যতে পাইকগাছার অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর বিনোদনের পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

‎এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া এই ঐতিহ্যবাহী পার্ক আর যেন অবহেলার শিকার না হয়। দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে পার্কটির সৌন্দর্যবর্ধন, পুকুর সংস্কার, সবুজায়ন, আলোকসজ্জা, বসার স্থান, শিশু কর্নার, হাঁটার পথ এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে মধুমিতা পার্ককে তার হারানো ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Comments are closed.

More News Of This Category
© All rights reserved © 2019 LiveTV
Powered By WP Solution