সুনামগঞ্জের ছাতকের পেপার মিল ও লক্ষিবাউর এলাকায় সুরমা নদীর তীরে নোঙর করা বিভিন্ন নৌযান থেকে নিরাপত্তার অজুহাতে প্রকাশ্যে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, চাঁদা দিলে নৌযান নিরাপদ থাকে, আর না দিলে চুরি, ছিনতাই, মারধর ও নানা ধরনের হয়রানির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
স্থানীয়ভাবে ‘বডি’ নামে পরিচিত মালবাহী নৌযান, কার্গো, ট্রলারসহ বিভিন্ন নৌযান থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিরাপত্তা প্রহরীর বেতনের নামে নৌ-যান থেকে ২০০ টাকা করে আদায় করছে বলে অভিযোগ করেছেন শ্রমিকরা।
এছাড়া লক্ষীবাউর এলাকায় নিরাপত্তা পহরী সহ ভিন্ন কায়দায় স্থানীয় একটি মাদরাসার ধার্য করা ১০০ টাকার রশিদ দিয়ে রাতের আধারে ৩০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ উটেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় প্নিরাপত্তা প্রহরীর নামে ১০০ টাকা,গাছে নৌযান বাঁধার চার্জ ১০০ টাকা ও মাদ্রাসা মসজিদের নামে ধার্যকৃত ১০০ টাকাসহ মোট ৩০০ টাকা করে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়। অন্যদিকে নদীতে চলাচল রত এসব নৌযান থেকে হিজড়া জনগোষ্ঠী আরো ২০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ করেছেন শ্রমিকরা। অনুসন্ধানে এসব অর্থ আদায়ের সত্যতা মিলেছে। যদিও হিজড়া সরদার পাখি জানিয়েছেন তারা জোর করে কোনো টাকা উটান না।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি টেন্ডার বা বৈধ ইজারা ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর টোল বা মাশুল আদায়ের আইনগত সুযোগ নেই। কিন্তু সেই নিয়ম উপেক্ষা করে একদল লাঠিয়াল ও লাইনম্যান নৌযান ঘাটে ভিড়লেই বিভিন্ন অজুহাতে ২০০ ও ৩০০ টাকা করে আদায় করছে। এ ঘটনায় পেপার মিল এলাকায় আজিম উদ্দিন, তাজির উদ্দিন ও স্থানীয় শ্রমিক নেতা এলেমান এবং লক্ষিবাউর এলাকায় জলিল সহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। এতে নদীপথ ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী, মাঝি, নৌযান শ্রমিক ও বডি মালিকেরা অবিলম্বে এ ধরনের অবৈধ অর্থ আদায় বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আজিম উদ্দিন ও তাজির উদ্দিন বলেন, এখানে চুরি-ডাকাতি প্রতিরোধে ভলগেট মালিক ও শ্রমিক সমিতির উদ্যোগে নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বেতন পরিশোধের জন্য নৌযানের ধরন অনুযায়ী ৫০, ১০০ ও ২০০ টাকা নেওয়া হয়।
একই বক্তব্য দিয়েছেন উড়াইল নৌযান শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি মিন্নত আলী, ও স্থানীয় শ্রমিক নেতা এলেমান, তিনি তার উপর আনিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন। আমি প্রতিপক্ষের সরযন্ত্রের স্বীকার। মালিক শ্রমিক সংগঠনের অনুমতিক্রমে নিরাপত্তা পহরীর বেতনের জন্য এসব অর্ধ আদায় করা হয়। এটা কোনো চাঁদাবাজি নয়।
অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারকে নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধের পরও নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় সম্পূর্ণ অবৈধ। তাদের দাবি, চাঁদা দিলে চুরি-ডাকাতি কমে যায় এবং চাঁদা না দিলে অপরাধ বেড়ে যায়-এমন পরিস্থিতি প্রকৃতপক্ষে একটি কৌশলগত চাঁদাবাজির ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি নিয়ে দুই নৌযান শ্রমিকের একটি ভিডিও বার্তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ছাতক থানা পুলিশ ও নৌপুলিশের পৃথক দুটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
লক্ষিবাউর এলাকার অর্থ আদায়কারী আব্দুল জলিল জানিয়েছেন,তিনি পহরীর ভাবত ১০০ টাকা উটান, আর গাছে বাধার জন্য ১০০ টাকা নেন অন্যরা। এগুলা তাদের লিজকৃত গাছ। গাছগুলা সরকারী সড়কে হলেও সেটি যাদের নামে লিজ তারাই নেন।
পেপার মিল বাজার ব্যাবসায়ী কমিটির সভাপতি খায়ের উদ্দিন বলেন এখানে কোনো চাঁদাবাজি হয় না,চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। তবে নিরাপত্তা পহরীর জন্য যে টাকা উটানো হয় সেটা মালিক ও শ্রমিক সমন্বয়ে। নৌযান এখানে থাকায় বাজারে কিনাবেচা বেড়েছে। এরজন্য আমরাও তাদের কে সহযোগিতা করি।
হিজড়া সরদা পাকি জানান আমরা জোর করে টাকা উটাইনা, শ্রমিকরা খুশি হয়ে দিলে নেই।
লক্ষিবাউর মাদ্রাসার সভাপতি লিয়াকত আলী ও কোষাধ্যক্ষ কুটি মিয়া জানিয়েছেন মাদ্রাসার ১০০ টাকা অনকে আগেই শ্রমিকরা ধার্য করেছে। আমরা জোর করে নেইনা। গাছ ও নিরাপত্তার নামে উটানো ২০০ টাকা যারা উটায় তা অনুসন্ধান করে দেখেন। মাদ্রসার টাকা উটানোর জন্য আলাদা লোক রয়েছে।
কিন্তু শ্রমিকদের দাবী প্রতিদিন রাত ৮ টার পর এক সাথে ৫-৭ জন আসেন মাদ্রাসার ১০০ টাকার রশিদ নিয়ে। আর এই রশিদ ধরিয়ে দিয়েই ৩০০ নেয় তারা। নাদিলে খারাপ আচরন করে। এসব বিষয়ে শ্রমিকদের দেওয়া একাধিক ভিডিও বক্তব্য রয়েছে প্রতিনিধির হাতে।
জানতে চাইলে ছাতক নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোঃ আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন মালিক শ্রমিক সমজতায় যদি কোনো নিরাপত্তা পহরীর বেতনের জন্য এসব অর্থ উত্তোলন হয় তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে এসব বিষয়ে কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব। এছাড়া হিজড়ারা মুসেলকা দিয়ে গেছে জোরপূর্বক কোনো অর্থ আদায় না করার শর্তে। শ্রমিকরা তাদের ইচ্ছায় কোনো অর্থ দিলে দিতে পারে। এ বিষয়েও কোনো অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ছাতক-দোয়ারাবাজার সার্কেল) শেখ মোরছালিন বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে তথ্য নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।