September 14, 2026, 5:01 am

টেকসই কৃষিতে দানাদার ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে ন্যানো ইউরিয়া: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাংলাদেশের করণীয়

Reporter Name
  • Update Time : Friday, August 7, 2026
  • 18 Time View

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, মাটির উর্বরতা হ্রাস, পরিবেশ দূষণ এবং রাসায়নিক সারের ওপর অতিনির্ভরশীলতা—সব মিলিয়ে কৃষিকে আরও দক্ষ, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এই প্রেক্ষাপটে কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষ করে ন্যানো তরল ইউরিয়া, হতে পারে টেকসই কৃষির একটি যুগান্তকারী সমাধান।

বাংলাদেশে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইউরিয়া সারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ২৬ লক্ষ টন ইউরিয়া, ১০ লক্ষ টন টিএসপি এবং ১৬ লক্ষ টন ডিএপি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির জৈব পদার্থ, উপকারী অণুজীব এবং প্রাকৃতিক উর্বরতা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু মাটিতেই সীমাবদ্ধ নয়; জলাশয়, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ন্যানো প্রযুক্তির মূল ধারণা হলো অতি ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে অধিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। ন্যানো ইউরিয়ার কণাগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে সেগুলো গাছের পাতা, কাণ্ড ও শিকড়ের মাধ্যমে সহজেই শোষিত হয়। ফলে গাছের পুষ্টি গ্রহণের দক্ষতা বাড়ে এবং একই পরিমাণ ফলন পেতে তুলনামূলক কম সার ব্যবহার করা সম্ভব হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত দানাদার ইউরিয়ার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ন্যানো ইউরিয়া দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। প্রচলিত ইউরিয়ার নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা যেখানে গড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ, সেখানে ন্যানো ইউরিয়ার কার্যকারিতা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ একই পরিমাণ পুষ্টি সরবরাহে কম সার প্রয়োজন হয়, অপচয় কমে এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পায়।

ন্যানো ইউরিয়ার আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি ধীরে ধীরে গাছকে পুষ্টি সরবরাহ করে। ফলে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন মাটিতে বা পানিতে অপচয় হয় না। এর ফলে নাইট্রাস অক্সাইডসহ গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রচলিত ইউরিয়া উৎপাদন নিজেই একটি উচ্চ কার্বননির্ভর শিল্প। প্রতি টন ইউরিয়া উৎপাদনে গড়ে প্রায় ২.৬৮ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নির্গত হয়। এছাড়া প্রতি টন ইউরিয়া উৎপাদনে প্রয়োজন হয় প্রায় ৩০.১ গিগাজুল শক্তি, ১২.৮ ঘনমিটার পানি এবং ১৭৩.৭ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ। ফলে ইউরিয়ার চাহিদা কমানো মানেই শুধু সার সাশ্রয় নয়; একই সঙ্গে জ্বালানি, পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহারও কমানো সম্ভব। ন্যানো ইউরিয়ার ব্যবহার এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের পরিবেশগত ক্ষতিও কম নয়। কৃষিজমি থেকে ধুয়ে যাওয়া নাইট্রোজেন জলাশয়ে পৌঁছে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত নাইট্রোজেন মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করে, অক্সিজেন গ্রহণে সমস্যা সৃষ্টি করে, রক্তের লোহিত কণিকার সংখ্যা কমায় এবং প্রজনন ক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। ফলে ন্যানো ইউরিয়ার মতো অধিক দক্ষ সারের ব্যবহার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২–২৩ অর্থবছরে দেশের ইউরিয়ার মোট চাহিদা ছিল প্রায় ২৬ লক্ষ টন। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন মাত্র ১০ লক্ষ টন; বাকি ১৬ লক্ষ টন আমদানি করতে হয়েছে। সরকার কৃষকদের স্বল্পমূল্যে সার সরবরাহ করতে বিপুল ভর্তুকি প্রদান করে। যদি ন্যানো ইউরিয়ার ব্যবহার সম্প্রসারণ করা যায় এবং ধাপে ধাপে দানাদার ইউরিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়, তাহলে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং সরকারি ভর্তুকি—সবই উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ভারত, ইতোমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে ন্যানো তরল ইউরিয়া ব্যবহার করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এই প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার শুরু হয়নি। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাস সংকট, এলএনজির সরবরাহ সমস্যা এবং কয়েকটি সার কারখানা বন্ধ থাকার কারণে ইউরিয়া উৎপাদন ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি এ ধরনের সংকট আরও তীব্র হয়, তাহলে ন্যানো ইউরিয়া দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

তবে ন্যানো ইউরিয়ার প্রসারে কিছু বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, দেশের বিভিন্ন কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চলে এর কার্যকারিতা নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা পরিচালনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি, যাতে তারা সঠিক মাত্রা ও পদ্ধতিতে ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহার করতে পারেন। তৃতীয়ত, তরল ন্যানো সারের নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহারবিষয়ক নীতিমালা দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তিকে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।

টেকসই কৃষির মূল লক্ষ্য হলো—কম সম্পদ ব্যবহার করে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ করা। ন্যানো ইউরিয়া সেই লক্ষ্য পূরণে একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। এটি দানাদার ইউরিয়ার সম্পূর্ণ বিকল্প না হলেও সারের ব্যবহার দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

বাংলাদেশের কৃষি এখন একটি রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সময়ের দাবি হলো, গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে নতুন প্রযুক্তিকে যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং কৃষকবান্ধব নীতিমালার মাধ্যমে সেগুলোর নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। ন্যানো ইউরিয়া সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হতে পারে। পরিকল্পিত গবেষণা, কার্যকর নীতিসহায়তা এবং কৃষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতের টেকসই কৃষি ব্যবস্থায় ন্যানো ইউরিয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে।

মোহাম্মদ কমরুদ্দিন
সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

Please Share This Post in Your Social Media

Comments are closed.

More News Of This Category
© All rights reserved © 2019 LiveTV
Powered By WP Solution