উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জয় চন্দ্র সরকার (২৩)-এর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয় তাদের ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা।
জয় চন্দ্র সরকার দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মন্মথপুর ইউনিয়নের কৈবত্যপাড়ার বাসিন্দা। তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতে অবস্থান করছিলেন এবং পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতে অবস্থিত ব্রেইনওয়্যার ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছিলেন।পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৬ আগস্ট রাত আনুমানিক ৮টার দিকে জয়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের মেসেঞ্জার থেকে তার বাবা রঞ্জিত চন্দ্র সরকারকে একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে জানানো হয়, জয় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।হঠাৎ এমন সংবাদ পেয়ে পরিবারের সদস্যরা হতবাক হয়ে পড়েন। কারণ, জয়ের আচরণে আত্মহত্যার মতো কোনো পূর্বলক্ষণ তারা দেখতে পাননি বলে দাবি পরিবারের।স্বজনদের ভাষ্য, জয় নিয়মিত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। পড়াশোনা শেষ করে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তার। এ কারণে তার মৃত্যুকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা।নিহতের বাবা রঞ্জিত চন্দ্র সরকার বলেন, তার ছেলে মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছিল। আত্মহত্যা করার মতো কোনো কারণ বা মানসিক অবস্থার কথা তারা কখনো জানতে পারেননি। তাই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা সন্দেহে এক নারীকে ভারতের বারাসাত থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাখা হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে ভারতীয় পুলিশের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এখনো পরিবারের হাতে আসেনি।পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় ভারতে যান জয় চন্দ্র সরকার। প্রথমে দিল্লির সারদা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন তিনি। পরবর্তীতে বিষয়টি পছন্দ না হওয়ায় ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতে ব্রেইনওয়্যার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। সেখানে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।জয়ের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছালে পার্বতীপুরের মন্মথপুর কৈবত্যপাড়ায় নেমে আসে শোকের আবহ। স্বজন, প্রতিবেশী ও সহপাঠীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই জয়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশের পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই জয় চন্দ্র সরকার শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে পরিবার ও দেশের জন্য কাজ করার স্বপ্ন ছিল তার।ঘটনার বিষয়ে পার্বতীপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল ওয়াদুদ জানান, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে । এদিকে জয়ের পরিবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছে। তাদের দাবি, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থারও দাবি জানিয়েছেন তারা।জয় চন্দ্র সরকারের মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ ও ভারতে থাকা তার সহপাঠী ও পরিচিতজনদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিবারের প্রত্যাশা, দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে এই মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটিত হবে।