September 14, 2026, 5:00 am

পেকুয়ায় এবার ডাকাত-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রাস্তায় সাধারণ নারী-পুরুষ

Reporter Name
  • Update Time : Sunday, August 9, 2026
  • 26 Time View

কক্সবাজারের পেকুয়ায় পাহাড়ে বেড়েছে অপরাধীদের দৌরাত্ম। এ অপরাধীদের বিরুদ্ধে এবার রাস্তায় নামলেন পাহাড়ে বসবাসকারী সর্বস্তরের নারী-পুরুষেরা। উপজেলার বারবাকিয়া ও টইটং ইউনিয়নের পাহাড়ী অঞ্চলে বেড়েছে অপরাধ তৎপরতা। এক সময় ওই অপরাধ চক্রের হাতে মানুষ ছিল জিম্মী। খুন-খারাবি,বনভূমি দখল,গাছ পাচার,পাহাড় কাটা ও অবৈধভাবে বালু দস্যূতা ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক। অপরাধীদের অত্যাচারে অনেকেই ছেড়েছে এলাকা ও বসতবাড়ি। একাধিক হত্যাকান্ডে সংঘটিত হয়েছিল। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক। মানুষ এদের ভয়ে মুখ খোলার সাহস পেত না। পাহাড়ে চলতো এদের নিজস্ব শাসন। ওরা দিনকে রাত, রাতকে দিন মনে করতো।

আইনের শাসন ও ন্যায়-নীতির প্রতি ছিল না কোন তোয়াক্কা। দিব্বি অপরাধ করে গেলেও এদের বিরুদ্ধে ছিলনা আইনের কোন প্রয়োগ। মানুষের বসতবাড়ি জায়গা কেনাবেচা, পাহাড়ের গাছ-গাছালী বালুমহল সবকিছুতেই চলতো এদের চাঁদাবাজি। দাবীকৃত চাঁদা ছাড়া বাড়িঘর করা তো দূরের কথা পাহাড়ি অঞ্চলে প্রবেশ করাও কঠিন ছিল। গত কয়েকবছর এসব থেকে নিঃস্কৃতি পায় পাহাড়ের বসবাসরত জনগুষ্টি।

এদিকে সম্প্রতি পেকুয়ায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় আবারও আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার উপক্রম দেখা গেছে। ফের বেড়েছে অপরাধ তৎপরতা।

ভূক্তভোগীরা জানান, চাঞ্চল্যকর সালমা হত্যা মামলার প্রধান আসামী বারবাকিয়ার পাহাড়িয়াখালীর ডাকাত জাফর আহমদের দু-পুত্র দূধর্ষ সন্ত্রাসী আলমগীর ও জাহাঙ্গীর জেল থেকে বের হয়েছে। সম্প্রতি ওই অপরাধীরা জামিন নিয়ে এলাকায় অবস্থান করছে। পূর্বের একই কায়দায় আলমগীর ও জাহাঙ্গীর পাহাড়ে ফের অপরাধ তৎপরতায় জড়িয়ে গেছে।

বিগত বিশ বছর আগে থেকে আলমগীর ও তার ভাই বনরাজা খ্যাত জাহাঙ্গীর আলম পাহাড়ের অঘোষিত রাজা। টইটং ও বারবাকিয়ার পাহাড়ী অঞ্চলে এদের নিজস্ব বাহিনী ছিল। ২০২০ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর সালমা বেগম (২৫) খুন হয়। সালমা ছিল আলমগীরের চতুর্থ স্ত্রী। এর আগে একাধিক নারীর সাথে আলমগীরের বিয়ে হয়। সালমা টইটংয়ের পন্ডিত পাড়ার মৃত বাদশা মিয়ার মেয়ে। অপূর্ব সুন্দুরী ছিল। পেশীশক্তি ও লোভে পড়ে মেয়েটিকে আলমগীরের হাতে তুলে দেয়া হয়। বিয়ের মাত্র ৩ মাসেই সালমাকে নৃশংসভাবে খুন করে। পেকুয়া থানায় হত্যা মামলা ০৬ /২০ রুজু হয়। এ মামলায় পুলিশের হাতে আলমগীর গ্রেফতার হয়। ৫ বছর জেলে ছিল সালমা হত্যা মামলার আসামী আলমগীর।

গত ২ মাস আগে জেল থেকে বের হন ওই ঘাতক আলমগীর। বিগত ৬ মাস আগে বের হয় তার বড় ভাই জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীর আলমও অপরাধ জগতের সম্রাট এবং সাবেক এমপি বাইট্টা জাফরের ক্যাডার। বিগত কয়েকবছর আগে অস্ত্রসহ চট্রগ্রাম শহরে র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়। জাহাঙ্গীরও জেলে ছিল। তিনিও জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে। হত্যা,ডাকাতি, চাঁদাবাজী,ধর্ষণসহ অন্ততঃ এক ডজন মামলার আসামী সে। তার বড় ভাই জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধেও অন্ততঃ ৩৩টি মামলা চলমান আছে। একটিতে হয়েছে দশ বছরের সাজা। আলমগীর জামিনে বের হওয়ার পর তারা স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছে পাহাড়ী এলাকায়। ফলে আতংকে দিন কাটছে পাহাড়ে বসবাসকারী অবলা পাহাড়ীদের। সব চাইতে ঝুঁকিতে আছে নারীরা।
সম্প্রতি পেকুয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে আবারও বেড়েছে অপরাধ তৎপরতা। জামিনে এসে পূর্বের ন্যায় আলমগীর চাঁদাদাবীর মত গুরুতর অপরাধের সাথে লিপ্ত হচ্ছে। তাদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে এবার রাস্তায় নেমেছে টইটংয়ের আবাদী ঘোনা,লেইনের শিরা,হারকিলার ধারা নামক পাহাড়ি এলাকার অসহায় নারী-পূরুষেরা।
রবিবার (৯আগষ্ট) বিকাল ৫টায় উপজেলার টইটং ইউনিয়নের ধনিয়াকাটা বাজারে মানবন্ধন অনুষ্টিত হয়। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন ভুক্তভোগী নারী-পুরুষেরা।
মানববন্ধনে নারী-পুরুষরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,কার ইশারায় ও সহযোগিতায় জামিনে মুক্তি পেল তা খতিয়ে দেখার জন্য মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে জোর দাবী জানান।
তারা বলেন,বারবাকিয়া ইউনিয়নের ছনখোলার ঝুম,পূর্ব পাহাড়িয়াখালী, মিয়ারঝুম,চাকমারডুরি,টইটংয়ের আবাদীঘোনা,লেইনের শিরাসহ আশপাশের দূর্গম এলাকার বসতিদেরকে চাঁদা দেয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে অনবরত। অন্যথায় এলাকা ছাড়া করার হুমকি দিচ্ছে।

ভূক্তোভোগী মোকতার আহমদ বলেন, তাদের দাবীকৃত চাঁদা না দেয়ায় তার ঘরটি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। মোকতার ২০০৬ সালে সামাজিক বনায়নের আওতায় সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মোকতার আহমদসহ শতশত ভূমিহীন লোকদের মাঝে এ বনভূমির জমি বরাদ্ধ দেন।

ভূক্তভোগী বৃদ্ধা শাহেদা বেগম বলেন, আমার নিজস্ব কোন জমি না থাকায় বহুকষ্টে পাহাড়ে এসে বসবাস করি। পাহাড়ে বসতি স্থাপন করলে নাকি ডাকাত জাহাঙ্গীর ও আলমগীর বাহিনীকে চাঁদা দিতে হবে। চাঁদা না দিলে আমাকে উচ্ছেদ করে দিবে বলে প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে আহবান জানাচ্ছি দ্রুত ডাকাত জাহাঙ্গীর ও আলমগীর বাহিনীকে গ্রেফতার করা হউক।
ভুক্তভোগী টইটংয়ের ধনিয়াকাটার বাসিন্দা সিএনজি চালক মহিউদ্দিন বলেন, আলমগীর জেল থেকে এসে আবারো পূর্বের ন্যায় চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে যাচ্ছে। আমি শ্রমিকদল করি। ২০০৬ সালে হারকিলার ধারায় উপকারভোগী হিসাবে ১ হেক্টর বনের অংশীদার হই। সেখানে বাড়ি আছে। স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবার নিয়ে থাকি। দুদিন আগে আলমগীর গিয়ে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবী করে। আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমার স্ত্রীকে হাকাবকা করেছে। ভয়ে স্ত্রীসহ আমরা পাহাড় থেকে বাড়ি ফেলে চলে আসি। খুন-খারাবির মত পরিস্থিতি আশংকা করছি।
মনোয়ারা বেগম নামক এক নারী জানান, আমরা ভয়ের মধ্যে আছি। আলমগীর অপরাধী, আবার দুঃশ্চরিত্রেরও লোক। বহু নারীর সম্ভ্রম হরণ হয়েছে। মান-ইজ্জত ও নিরাপত্তার ভয়ে মুখ খুলতাম না কেউ। কিছুদিন চিন্তামুক্ত ছিলাম। কারণ সে জেলে ছিল। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী আবাদীঘোনা সমাজ কমিটির সর্দার রহিমদাদসহ বেশ কয়েকজন নারী-পূরুষ বলেন, এক সময় এখানে প্রতিবাদ করলে জানমালের নিরাপত্তা ছিল না। অত্যাচারীরা আবারো এলাকায় অবস্থান করায় মানুষের মধ্যে ভয় ও আতংক বেড়েছে। আমরা অতিদ্রুত ডাকাত জাহাঙ্গীর ও আলমগীরসহ তাদের বাহিনীদের গ্রেফতারের দাবী জানাচ্ছি।
ছনখোলার ঝুমের বাসিন্দা লোকমান বলেন,এ পাহাড় পার্বত্য চট্রগ্রামের মত অশান্ত ছিল। গুটিকয়েক সন্ত্রাসীর কাছে সাধারণ মানুষ এক প্রকার জিম্মি ছিল। সাবেক এমপি’র জাফর আলমের চত্রছায়ায় তারা এসব করেছে।
শফিউল আলম মিয়া নামক এক বাসিন্দা বলেন, আমরা কি পূর্বের ন্যায় আবারো সন্ত্রাসীর হাতে জিম্মি থাকব। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কে আহবান করবো আমরা পূর্বের ঘটে যাওয়া জিম্মিদশা থেকে পরিত্রাণ চাই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ডাকাত আলমগীর ও জাহাঙ্গীর আলমের সম্ভাব্য আস্তানায় যোগাযোগ করার পরও সাক্ষাত না দেয়ায় বক্তব্য দেয়া সম্ভব হয়নি।
পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান বলেন, কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়। এ ধরণের হয়ে থাকলে এবং লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Comments are closed.

More News Of This Category
© All rights reserved © 2019 LiveTV
Powered By WP Solution