এক হাতে স্টেনগান, অন্য হাতে ক্যামেরা—যুদ্ধক্ষেত্রে একসঙ্গে দুটি অস্ত্র নিয়েই লড়েছিলেন তিনি। একদিকে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে শত্রুর মোকাবিলা, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা ও বীরত্বের মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধরে রাখা—এ এক অনন্য ও সাহসিকতার সাধনা। এই দুরূহ কাজটি যিনি বাস্তবে করে দেখিয়েছিলেন, তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, ফটোসাংবাদিক ও সংগঠক এস এম সফি (এস এম সফি উদ্দীন)।আজ ১০ আগস্ট এই বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী।
১৯৩৪ সালের ১০ আগস্ট যশোরের চুড়িপটিতে জন্মগ্রহন করেন এস এম সফি,পিতা শেখ দলিল উদ্দিন ও মাতা আকলিমুন্নেসা। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটা অংশ কাটে ভারতের দার্জিলিংয়ে। জলপাইগুড়ির একটি স্টুডিওতে চাকরি করার সময়ই তাঁর হাতে প্রথম ক্যামেরা ওঠে এবং আলোকচিত্রের প্রতি গভীর টান তৈরি হয়। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে যশোরে স্থায়ী হন এবং ১৯৬৩ সালে শহরের ঐতিহাসিক রেল রোডে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফটো ফোকাস’ স্টুডিও।১৯৭২ সাল হইতে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনী অনুমোদিত ফটোগ্রাফার ছিলেন, তার সনামধন্য প্রতিষ্ঠান ছিল ষ্টুডিও “ফটো ফোকাস “নামে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি কেবল অস্ত্র হাতে লড়ে যাওয়া যোদ্ধাই ছিলেন না, ছিলেন একাত্তরের রক্তঝরা ইতিহাসের অনন্য আলোকচিত্রী।১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের অসংখ্য ছবি তুলেছে, স্বাধীনতা সংগ্রাম ছবি তুলেছে, ৭১এর ৯ মাস যুদ্ধ চলাকালীন রণাঙ্গনের সম্মুখ যুদ্ধের কয়েক হাজার ছবি তুলেছেন।
তিনি দেশে আসার পর হাজার হাজার ছবি তুলেছেন যার মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে তার ৫০০টিরও বেশি ঐতিহাসিক ছবি সংরক্ষণ থাকেলেও সংরক্ষণের অভাবে অনেক ছবি নস্ট হয়ে গেছে । তাঁর ক্যামেরায় বন্দী হয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর নৃশংসতা, গণহত্যার চিত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ সমরের বীরত্বগাথা।
যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রী জমিলা খাতুন ও সহযোদ্ধারাও ছিলেন তাঁর সঙ্গিনী ও সহযোগী। কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গ্রেনেড পৌঁছে দেওয়া কিংবা যশোরের রাস্তায় নারীদের লাঠি মিছিল থেকে শুরু করে চাঁচড়ার মোড়ে মুক্তিবাহিনীর অবস্থান, সিটি কলেজের কাছের গণকবর—এমন বহু ঐতিহাসিক মুহূর্ত তিনি ক্যামেরাবন্দী করেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর সংগৃহীত ঐতিহাসিক আলোকচিত্র নিয়ে প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ঢাকায় জাতীয় সংবর্ধনা পান। ২০০৬ সালে তাঁর তোলা দুর্লভ আলোকচিত্রগুলো একত্রিত করে ‘আলোকচিত্রে একাত্তর’ নামে একটি বিশেষ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ ডাক বিভাগও মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রকাশিত তাদের স্মারক ডাকটিকিটে তাঁর তোলা কয়েকটি ছবি ব্যবহার করে সম্মানিত করেছে।
পাকিস্তানী বাহিনী কত বর্বর কর্মকান্ড চালিয়েছে নিরীহ বাঙালিদের উপর। আলোকচিত্র শিল্পী এস এম শফির মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত হেলমেট, রনাঙ্গণের খবর শোনা ফিলিপস রেডিও এবং ১৯৬৯ সালে যশোর ঈদগাঁ মাঠের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণের রেকর্ড এখনও অক্ষত আছে।
সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠন ‘চেতনা’, নিমিকাওয়া ট্রেনিং স্কুল, ক্রীড়া সংগঠনসহ একাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের প্রবর্তক ছিলেন।
‘আলোকচিত্রে একাত্তর’। ফটোগ্রাফার এস এম সফি। সেই বইয়ে রয়েছে ছবির ইতিহাস। এস এম সফি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদারের আক্রমণ এবং তাদের নিষ্ঠুর বর্বরতার ছবি তুলেছিলেন। তিনি বেশির ভাগ ছবিই তুলেছিলেন যশোরের বিভিন্ন এলাকায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ৩ মার্চ যশোর টিএন্ডটি অফিসের সামনে পাকিস্তানি হানাদারের হাতে প্রথম শহীদ হন গৃহবধূ চারুবালা। তার মৃত দেহ নিয়ে মুক্তিকামী মানুষ মিছিল করে। সেই ছবি ধারণ করেছিলেন তিনি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আইকনিক রিকশায় পরে থাকা লাশের ছবিটিও একাত্তরের মার্চ মাসেই তোলা। তাঁর ছেলে আলোকচিত্রী সানোয়ার আলম (সানু) জানান‘ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ ছবিটি আমার বাবা তুলেছিলেন ১৯৭১ সালে। ওই দিন পাকিস্তানি আর্মি যশোর নিউমার্কেট এলাকায় সাধারণ বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। সেখান থেকেই এই ছবিটি তোলা হয়। এই এলাকার নাম এখন উপশহর।’
১৯৯৭ সালের ১০ আগস্ট ৬৩ বছর বয়সে এই মহান বীর ও ক্যামেরাযোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ক্যামেরায় বন্দি মুহূর্তগুলো কেবল ইতিহাসের দলিল নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক চিরন্তন স্থায়ী অনুপ্রেরণা।